হজ্জ ফরজ হওয়ার শর্ত কয়টি

 হজ্জ কাদের উপর ফরজ?


(হজ্জ ইসলামের পঞ্চম রোকন। যাহার নিকট আবশ্যকীয় খরচ বাদে মক্কা শরীফে যাতায়াতের মোটামুটি খরচ পরিমাণ অর্থ থাকে, তাহার উপর হজ্জ ফরয।) 

হজ্জ অতি বড় মরতবার ইবাদৎ। হাদীসে ইহার অনেক ফযীলত বর্ণিত হইয়াছে। রসূলুল্লাহ্ (দঃ) বলিয়াছেনঃ ‘যে হজ্জ গোনাহ্ এবং অন্যান্য খারাবী হইতে পবিত্র হইবে, তাহার পুরস্কার বেহেশ ব্যতীত অন্য কিছুই নহে।'

ওমরার জন্যও বড় সওয়াবের ওয়াদা করা হইয়াছে। হাদীসে আছে– হজ্জ এবং ওমরার উভয়ই গোনাহ্সমুহকে এমনভাবে দূর করিয়া দেয়, যেমন আগুন লোহার মরিচাকে দুর করিয়া দেয়।

যাহার উপর হজ্জ ফরয হয় সে যদি হজ্জ না করে, তবে তাহার জন্য ভীষণ আযাবের সংবাদ

দেওয়া হইয়াছে। হযরত (দঃ) বলিয়াছেন 'যাহার নিকট মক্কা শরীফে যাতায়াতের সম্বল

হওয়া সত্ত্বেও হজ্জ না করিবে সে ইহুদী বা নাছারা হইয়া মরুক, আল্লাহর সঙ্গে এবং আল্লাহর ইস্লামের সঙ্গে) তাহার কোন সংশ্রব নাই।' অন্য হাদীসে এরূপ বর্ণিত হইয়াছে যে, 'হজ্জ না করা ইসলামের তরীকা নহে।



১। মাসআলা সারা জীবনে মাত্র একবার হজ্জ করা ফরয। একবারের বেশী হজ্জ করিলে তাহা নফল হইবে এবং অনেক বেশী সওয়াব হইবে।

২। মাসআলাঃ না বালেগ অবস্থায় যদি কেহ হজ্জ করে, তবে সে হজ্জ নফল হইবে। বালেগ হওয়ার পর সম্বল হইলে হজ্জ পুনরায় করিতে হইবে।

৩। মাসআলাঃ অন্ধের উপর হজ্জ ফরয নহে; যত ধনই থাকুক না কেন। ৪। মাসআলা যখন কাহারও উপর হজ্জ ফরয হয় সঙ্গে সঙ্গে সেই বৎসরই হজ্জ করা

ওয়াজিব। বিনা ওযরে দেরী করা, এরূপ খেয়াল করা যে, এখনও অনেক সময় আছে, অন্য কোন

বৎসর হজ্জ করিব, ইহা দুরুস্ত নাই। অবশ্য ইহার ২/৪ বৎসর পরও যদি হজ্জ করে, তবে আদায়

হইয়া যাইবে, কিন্তু গোনাহ্গার হইবে ৫। মাসআলা মেয়েলোকের হজ্জের সফরে স্ত্রীলোকের নিজ স্বামী বা কোন মাহরাম পুরুষ সঙ্গে হওয়াও যরূরী। ইহা ব্যতীত হচ্ছে যাওয়া দুরুস্ত নাই। অবশ্য যদি কা'বা শরীফ হইতে এতটুকু দূরে বসবাস করে যে, তথা হইতে মক্কা শরীফ তিন মঞ্জিলের পথ না হয়, তবে স্বামী বা মাহ্রাম সঙ্গে না লইয়া হজ্জে যাওয়া দুরুস্ত আছে।

৬। মাসআলাঃ যদি সে মাহরাম না-বালেগ কিংবা এরূপ বদদ্বীন হয় যে, কোন মতেই তাহাকে বিশ্বাস করা যায় না, তবে তাহার সহিত যাওয়া দুরুস্ত নাই।

৭। মাসআলাযে মেয়েলোকের উপর হজ্জ ফরয হইয়াছে এবং বিশ্বাসযোগ্য মাহরাম রেশ্তাদার সঙ্গে যাইবার জন্য পাইয়াছে, তাহকে হজে যাইতে স্বামীর নিষেধ করা দুরুস্ত নাই। করিলেও তাহার কথা মানিবে না চলিয়া যাইবে।

৮। মাসআলা যে মেয়ে এখনও বালেগ হয় নাই, কিন্তু বালেগ হওয়ার কাছাকাছি পৌঁছিয়াছে, তাহার জন্যও ঘনিষ্ঠ মাহরাম রেশ্তাদার ব্যতীত একা একা বা বেগানা পুরুষের সঙ্গে বা গায়র মাহরাম রেশতাদারের সঙ্গে হজ্জের সফর করা যায়েয নহে।

৯। মাসআলা যে মাহরাম রেশতাদার বা স্বামী মেয়েলোকের হজ্জ করাইবার জন্য লইয়া যাইবে তাহার সমস্ত খরচ দেওয়া ঐ মেয়েলোকের উপর ওয়াজিব। ১০। মাসআলাঃ যে মেয়েলোকের উপর হজ্জ ফরয হইয়াছে, সে যদি সারা জীবন মারাম রেশতাদার না পাওয়ায় হজ্জ করিতে না পারে, তবে গোনাহগার হইবে না। অবশ্য শেষ জীবনে বদলী হজ্জ করাইবার অছীঅত করা ওয়াজিব হইবে। এইরূপ অছীঅত করিলে সে গোনাহ্ হইতে বাচিয়া যাইবে। মৃত্যুর পর তাহার ওলীওয়ারিসগণ তাহার টাকা দিয়া একজন লোককে মক্কা শরীফে হজ্জ করিতে পাঠাইবে। সে মরহুমার পক্ষ হইতে হজ্জ করিবে ইহাতে তাহার যিম্মা হইতে হজ্জ আদায় হইয়া যাইবে। অন্যের পক্ষে হজ্জ করাকে 'বদলী হজ্জ বলে।

১০। মাসআলাঃ হজ্জ ফরয হওয়ার পর আলস্য করিয়া দেরী করিলে এবং পরে অন্ধ বা শক্তিহীন হইলে বদলী হজ্জের জন্য অছীঅত করা ওয়াজিব।

১১।মাসআলা: যদি কেহ হজ্জ ফরয হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হজ্জ না করে এবং পরে গরীব হইয়া যায়, তবে ঐ ফরয তাহার যিম্মায় থাকিয়া যাইবে। যে কোন উপায়ে হজ্জ করিতে হইবে নতুবা ফরয তরকের গোনাহ্ থাকিয়া যাইবে। আগে অবহেলা করিয়াছে বলিয়া এখন গরীব হওয়া সত্ত্বেও মা’ফ পাইবে না।)

১২। মাসআলা যে নিজে হজ্জ করিতে পারে নাই, সে বদলী হজ্জের অহীঅত করিয়া মরিলে, দেখিতে হইবে যে, তাহার ষোল আনা ত্যাজ্য সম্পত্তি হইতে প্রথমে তাহার কাফন-দাফন ও করয আদায়ের পর যাহা অবশিষ্ট থাকে তাহার তিন ভাগের এক ভাগ দ্বারা হজ্জের সম্পূর্ণ খরচ হইতে পারে কি না। যদি তিন ভাগের এক ভাগ দ্বারা হজ্জের সম্পূর্ণ খরচ হইতে পারে, তবে ওয়ারিসগণের উপর তাহার পক্ষ হইতে তাহার বাড়ী হইতে সম্পূর্ণ যাযায়াত খরচ দিয়া বদলী হজ্জ করান ওয়াজিব। (কিন্তু যদি সম্পত্তি কম হয় এবং তিন ভাগের এক ভাগ দ্বারা একজন লোককে পাঠান না যায়, তবে বদলী হজ্জ করাইবে না। টাকাটা কোন হাজীর সঙ্গে পাঠাইয়া দিবে। সে যেখান হইতে ঐ টাকায় একজন লোককে নিতে পারে সেস্থান হইতে একজন লোকের যাতায়ত খরচ দিয়া বদলী হজ্জের জন্য লইয়া যাইবে; নতুবা) যদি বালেগ ওয়ারিসগণ নিজ নিজ অংশের দাবী ছাড়িয়া দিয়া, অথবা নিজ তহবীল হইতেই বদলী হজ্জের জন্য লোক পাঠায়, তবে তাহা আরও ভাল। কিন্তু নাবালেগ ওয়ারিস থাকিলে তাহার অংশে দাবী ছাড়িবার বা তাহার অংশ হইতে দান করিবার ক্ষমতা কাহারো নাই

হজ্জের ফরজ কয়টি ও কি কিঃ

১৩। মাসআলা : কেহ যদি হজ্জে বদলের অছিঅত করিয়া মারা যায়, কিন্তু ত্যাজ্য সম্পত্তির তৃতীয়াংশের দ্বারা হজ্জে বদল না হয় এবং তৃতীয়াংশের বেশী খরচ করিতে ওয়ারিশগণ সন্তুষ্ট চিত্তে অনুমতি না দেওয়ায় হজ্জে বদল করা না হয়, তবে অছিঅতকারীর গোনাহ্ হইবে না।

১৪। মাসআলাঃ সকল প্রকার অছিঅতেরই এই হুকুম। অতএব, যদি কাহারও যিম্মায় অনেকগুলি রোযা ও নামায কাযা বা বাকী থাকে কিংবা যাকাত বাকী থাকে এবং অছিঅত করিয়া মারা যায়, তবে শুধু ত্যাজ্য সম্পত্তির এক তৃতীয়াংশ হইতে এইগুলি আদায় করিতে হইবে। ওয়ারিশগণের আন্তরিক সন্তুষ্টি বাতীত এক তৃতীয়াংশের বেশী খরচ করা জায়েয নাই। পুর্বেও উহা বর্ণিত হইয়াছে।

১৫। মাসআলাঃ বিনা অছিঅতে মৃতের সম্পত্তি হইতে হজ্জে বদল করা দুরুস্ত নাই। অবশ্য যদি সকল ওয়ারিস খুশী হইয়া এজাযত দেয়, তবে জায়েয আছে। ইনশাআল্লাহ্ ফয হজ্জ আদায় হইবে। কিন্তু নাবালেগের এজাযতের মূল্য নাই। ১৬। মাসআলা : মেয়েলোক যদি ইদ্দতের অবস্থায় থাকে, তবে ইদ্দতপালন ছাড়িয়া দিয়া হজ্জের জন্য সফর করা তাহার জন্য জায়েয নহে।

১৭। মাসআলা : যাহার নিকট শুধু মক্কা শরীফ পর্যন্ত যাতায়াতের খরচ আছে, কিন্তু মদীনা শরীফ যাইবার খরচ নাই তাহার উপর হজ্জ ফরয হইবে। মদীনা যাওয়ার খরচ না থাকিলে হজ্জ ফরয নহে এরূপ ধারণা একেবারে ভুল।

১৮। মাসআলাঃ এহ্রামে মেয়েলোকের মুখ ঢাকার সময় মুখে কাপড় লাগান দুরুস্ত নাই। আজকাল এই কাজের জন্য একপ্রকার জালিদার পাখা পাওয়া যায়, উহা চেহারার উপর বাধিয়া লইবে। চোখ বরাবর জানি থাকিবে, উহার উপর বোরকা রাখিবে। ইহা দুরুস্ত আছে।

১৯।হজ্জের অবশিষ্ট মাসআলা হজ্জ করার সময় ছাড়া সবকিছু বুঝে আসিবে না এবং মনেও থাকিবে না। হজ্জে গেলে মোয়াল্লিম সবকিছু শিখাইয়া দিবে। ওমরার তরতীব সেখানে গেলে বুঝিতে পারিবে। এখানে হজ্জের প্রাথমিক কতিপয় কাজের উল্লেখ করা হইল।

২০।হজ্জে যাইবার সময় স্ত্রী, কন্যা ইত্যাদি যাহাদের ভরণ-পোষণ যিম্মায় থাকে ফিরিয়া আসার সময় পর্যন্ত তাহাদের খরচ দিয়া যাইতে হইবে। যদি পিতামাতা জীবিত থাকেন, তবে ফরয হজ্জ করিতে নিষেধ করিবার অধিকার তাহাদের নাই বটে, কিন্তু তাহাদের যদি খোরপোষের ব্যবস্থা না থাকে, বা পথে কোন প্রবল যুদ্ধের আশঙ্কা থাকে, বা নফল হজ্জ করিতে নিষেধ করে, তবে তাহাদের অনুমতি না লইয়া এবং তাহাদিগকে সন্তুষ্ট না করিয়া সফর করা জায়েয নাই। এইরূপে পাওনাদারকে সন্তুষ্ট না করিয়াও হজ্জের সফর করা জায়েয নহে।

২১।হজ্জে রওয়ানা হওয়ার পূর্বে খুব দেল গলাইয়া সমস্ত গোনাহ্ হইতে খাটি দেলে তওবা করিবে। যদি কাহারও কোন পাওনা-দেনা থাকে তাহা পরিশোধ করিবে, যাহাদের সহিত কাজ কারবার হইয়াছে তাহাদের নিকট হইতে মা'ফ চাহিয়া লইবে। যদি নামায, রোযা, যাকাত, কোরবানী, ফেত্রা, মান্নত, কাফফারা ইত্যাদি কোনকিছু যিম্মায় বাকী থাকে তাহা আদায় করিবে। দেনা আদায় করিবার পূর্বে যদি কোন পাওনাদার মারা গিয়া থাকে এবং তাহার ওয়ারিস থাকে, তবে তাহার পাওনা তাহার ওয়ারিসগণকে পৌছাইয়া দিবে। আর যদি ওয়ারিস না থাকে বা জানা না থাকে, তবে পাওনা পরিমাণ মাল গরীব-দুঃখীদিগকে দান করিয়া দিবে। আর যদি কাহারও কিছু শারীরিক বা মানসিক পাওনা থাকে, তবে তাহা মা'ফ চাহিয়া লইবে। যদি সে মারা গিয়া থাকে বা নিখোজ হইয়া গিয়া থাকে, তবে তাহার জন্য মাগফেরাত চাহিতে থাকিবে।

২২।হজ্জের খরচ হালাল মালের দ্বারা সংগ্রহ করিবে। কেননা, হারাম মালের দ্বারা কোন এবাদত কবূল হয় না।

২৩।এইসব হক্কুল এবাদ আদায় করার পর হজ্জের সফরের জন্য সৎ-সঙ্গী তালাশ করিবে। কেননা, সৎ-সঙ্গী ছাড়া এই সফর করা বড় কঠিন। যদি কোন নেক্কার আলেম সঙ্গী পাওয়া যায়, তবে অতি উত্তম

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ