মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া - নাজিম উদ দৌলা pdf download

 


বই রিভিউ: মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া

লেখক: নাজিম উদ দৌলা

ধরন: কন্সপিরেসি থ্রিলার

পৃষ্ঠা: ২৮৫

প্রকাশনী: আদী প্রকাশন

একটা থ্রিলার বইতে আপনি কী কী আশা করেন? থ্রিল থাকবে, সাসপেন্স থাকবে, একশন থাকবে, এডভেঞ্চার থাকবে, রহস্য থাকবে, টুইস্ট থাকবে, আর সাথে একতু রোমান্স হলেও মন্দ হয় না। ঠিক তেমনই একটা বই মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া। নাজিম উদ দৌলার লেখা এই বইটিকে আমার বাংলা মৌলিক থ্রিলার সাহিত্যের একটা মাইলফলক বলে মনে হয়েছে।
কাহিনীঃ
বইয়ের কাহিনী শুরু হয় ১৯৭১ সালের জার্মানিতে। এক কারাগারে একজন কয়েদির উপর টর্চার করা হচ্ছে। তার কাছে গোপন কোনো বস্তু ছিলো যেটার সন্ধান চাইছে অত্যাচারকারীরা। সেই কারাগারে আসেন একজন সাংবাদিক। ঐ কয়েদি সাংবাদিককে বলে দেয় যে ঐ গোপন বস্তুটা সে বাংলাদেশে লুকিয়ে রেখে এসেছে! এই পর্যন্ত পড়ে আমি মারাত্মক চমকে গেছি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সাথে জার্মানির কারাগারের কয়েদির সম্পর্ক কী তাই ভাই আমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছিলো।
এরপর আমরা চলে আসি বর্তমানে। আবরার আর লিজা নামে এক দম্পতি গেছে কার্ডিফে হানিমুন করতে। তাদের হানিমুনের মাঝেই বিভিন্ন অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে থাকে। কেউ কেউ তাদের ফলো করে, তাদের হোটেলে লিসেনিং বাগ লাগিয়ে রাখে, খাবারে বিষ মিশায়, আবার আবরারকে দেখা যায় অদ্ভুত আচরণ করতে- ভাবটা এমন যেন কার্ডিফ তার খুব চেনা অথচ এসেছে প্রথমবার। এভাবে রহস্য দানা বাঁধতে থাকে তাদের ঘিরে। এর মধ্যে আসে বইয়ের প্রথম টুইস্ট! আবরারের ব্যাগে তার বাবার একটা ডায়েরি খুঁজে পাওয়া পায় লিজা। এই ডায়েরি থেকেই কিছু রহস্যের জট খোলে আর আরও বড় ধরনের রহস্য সামনে চলে আসে!
বিন্যাসঃ
এটাই আমার কাছে এই বইয়ের সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং পয়েন্ট লেগেছে। এটা আমি বাংলাদেশে অন্য লেখকদের বইতে পাই না। ড্যান ব্রাউনের ভিঞ্চি কোড বইতে নায়ক যে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে সেই রাস্তার খুটিনাটি সব বর্ননা ছিলো। মনে হচ্ছিলো যেন নিজেই আমি ঐ রাস্তা দিয়ে হাঁটছি আর সব দেখছি। এত জীবন্ত বর্ননার কারণে ড্যান ব্রাউন বর্তমান বিশ্বের এক নম্বর থ্রিলার লেখক। বাংলাদেশে সেটা নাজিম ভাইয়ের বইতে পেলাম। মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া বইতে উনি স্থান কাল পাত্রের এত সুন্দর বর্ননা এনেছেন যে আমি বইয়ের ভেতরেই ঢুকে গিয়েছিলাম। লেখকের দায়িত্ব হচ্ছে তার বইয়ের দৃশ্যগুলো পাঠকের চোখের সামনে একদম জীবন্ত করে তোলা যেন মনে হয় চোখের সামনেই ঘটছে। বিশেষ করে থ্রিলার বইতে এটা খুবই জরুরি। কার্ডিফ শহর, জার্মানির হোনাসপার্গ দূর্গ আর কেরানিগঞ্জ গ্রামে জীবনে না গিয়েও মনে হচ্ছিলো আমি যেন সব চিনে ফেলছি এই বই পড়েই।
এই বইয়ের একটা সমালোচনা অনেকেই করেছেন দেখেছি। অ্যাকশন সিনগুলাতে স্থানীয় পুলিশের উপস্থিতি নেই। আমার কাছেও সেটা মনে হয়েছিলো পড়ার সময়। কিন্তু পরে মনে হলো যে মেইন ভিলেন তো অনেক পয়সাওয়ালা আর শক্তিশালি লোক। ভাড়াটে সৈনিক নিয়ে এসে সে যুদ্ধ করতে পারে। তার নিশ্চয়ই পুলিশ প্রশাসনে প্রভাব আছে। এই কারণেই সে পুলিশকে দূরে সরিয়ে রাখতে পেরেছে। আর তাছাড়া, যদি পুলিশে খবর দেওয়া হয়ও, তাদের কোনো একশনে যাওয়ার সুযোগ ছিলো না। কারণ ঘটনাগুলো পর পর ঘটে যাচ্ছিলো তখনই শুরু হলো সুনামি। তখন তো সবাই জান নিয়ে পালাচ্ছে। ঐ অবস্থায় পুলিশ কোনো ক্রাইমের তদন্ত করবে কীভাবে? তারা মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে ব্যস্ত। তাই এখানে পুলিশের অনুপস্থিতি আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়েছে।
ক্লাইমেক্সঃ
বইটিতে অনেকগুলো টুইস্ট আছে। নাজিম উদ দৌলা ভাইকে টুইস্ট মাস্টার বলা হয় এই কারণেই আসলে। তার লেখা মানেই টুইস্টে ভরপুর। দুই তিন চ্যাপ্টার পরেই এমন কিছু ঘটছিলো যে পুরা গল্পের মোড়টাই ঘুরে যাচ্ছিলো। এভাবে গল্পটা জমছিলো দারুণ। নাজিম ভাই একটু একটু করে দিচ্ছিলেন মাল মশলা শুরুতে। এগারো নাম্বার চ্যাপ্টার থেকেই বইতা দৌড়াতে শুরু করে। তখন তো আর থামাথামি নেই! টানা অনেক্ষক অ্যাকশন আর অ্যাডভেঞ্জার চলেছে। বিশেষ করে শেষের ১০ চ্যাপ্টারে বিরতিহীন সাসপেন্স!
উত্তেজনা তুঙ্গে চলে গিয়েছিলো শেষের কয়েক চ্যাপ্টারে। সুনামি চলে এলো, গোটা কার্ডিফ শহর ডুবে গেছে পানিতে। এরই মধ্যে এক হোটেলের ছাদে চলছে দুই গ্রুপের ফাইট। জার্মান নাৎসি বাহিনি আর রোমানিয়ান ভাড়াটে মার্সেনারিদের তুমুল যুদ্ধ। এরই মাঝে আবরার আর তার সাথে আরেক অপ্রতাশিত ব্যক্তিও যুদ্ধে যোগ দিলো। আর সবশেষে সবচেয়ে মারাত্মক টুইস্টটা পেলাম! বইটাই হাত থেকে ফেলে দিচ্ছিলাম আরেকটু হলে।
ইন্টারেস্টিং_পয়েন্টঃ
এই বইয়ের সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে পাজল সমাধান। বাংলাদেশে কোনো রাইটারের লেখায় আমি এটা পাইনি। ড্যান ব্রাউনের বইগুলাতে যেমন মারাত্মক পাজল থাকে সেটা পেলাম নাজিম ভাইয়ের বইতে। তাছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে যেসব মারাত্মক ঘটনা ঘটেছে কিন্তু আমরা জানি না, সেটা নাজিম ভাই তুলে এনেছেন। এই বইতেই প্রথম আমি রাশিয়ান সৈনিকদের গনহারে রেপ করার ঘটনা শুনেছি। এর আগে তো শুধু জার্মানদের খারাপ বলেই জানতাম। এবার দেখলাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আরেকরূপ। তাছাড়া হিটলারের মৃত্যু রহস্য এবং জার্মানির পারমানবিক বোমা বানানোর প্রচেস্টা সম্পর্কে আমার জানা ছিলো না। এই বইতে এসব জেনেছি। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাথে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে যেভাবে লেখক কানেক্ট করেছেন, সেটাও কিন্তু অসাধারণ ছিলো। নাজিম ভাইয়া কত্তগুলা বই পড়ছেন এই বইটা লেখার জন্য। শেষে সেই বইয়ের লিস্ট দিয়েছেন। এত পরিশ্রম করে লেখার জন্য উনাকে অনেক ধন্যবাদ।
মতামতঃ
বইটিতে অনেক ভালোলাগার ভিড়ে একটা সমালচনা করার মতো পয়েন্ট হচ্ছে বানান সমস্যা। অনেক জায়গায় বানানের সমস্যা ছিলো। আমার একটা জিনিস মনে হয় যে রিভিউতে সব বানান ভুল ধরে ধরে বলার দরকার নেই। কারণ এটা লেখকের ভুল না, প্রকাশক আর প্রুফ রিডারের ভুল। তাই রিভিউতে আর সেসব নিয়ে কথা বললাম না।
আপনি যদি থ্রিলার লাভার হন, তাহলে এই বইটা নিঃসন্দেহে মাস্ট রিড। হ্যাপি রিডিং।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ